9/7/14

বসন্তের চমৎকার একটা বিকেল

বসন্তের চমৎকার একটা বিকেল। একটা পার্ক।
পার্কের বেঞ্চে বসে আছে লোকটা। একজন বড় ব্যবসায়ী সে। তিন তিনটা বিশাল কারখানা তার। এই মাসে বড় তিনটা কোম্পানির সাথে বিশাল অঙ্কের চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। দুইটার সাথেই হয়েছে, একটার সাথে হয়নি। এটা নিয়ে মন খুব খারাপ তার। যে দুইটার সাথে হয়েছে ওখান থেকে অনেক টাকা লাভ হবে এটা নিশ্চিত। কিন্তু সে সন্তুষ্ট না। তিনটা হলেই সবচেয়ে খুশি হতো। উদাস সে। মন খারাপ।

পাশেই বসে ছিল এক তরুণ। ছেলেটার মনও খারাপ। তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। যেন জবাব খুঁজছে কোন না জানা প্রশ্নের।

ব্যবসায়ী সেই ছেলেটার সাথে পরিচয় হলে শুনলো, ছেলেটা পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেছে আজ তিন বছর। একটা জব পাচ্ছে না। বাসায় অসুস্থ বাবা, ছোট ভাই-বোন। খুব কষ্টে চলছে দিন।

ব্যবসায়ী ভাবল, "আচ্ছা এই ছেলেটার একটা চাকরি পর্যন্ত নেই। আর সে এত টাকার মালিক। শুধু একটা মাত্র কন্ট্রাক্ট বাতিল হয়েছে বলে, সে মন খারাপ করছে। কিন্তু তার অবস্থা তো এই ছেলের চেয়ে অনেক অনেক গুণ ভাল। তার গাড়ি আছে, আছে নিজের বাড়ি।"
মনে মনে লজ্জিত হল ব্যবসায়ী।

চলে গেল সে। ঝেড়ে ফেলল মন খারাপ ভাব।

২।
বেকার ছেলেটা বসে আছে তো আছেই। নিজের জীবনের উপর সাথে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর উপর বিরক্ত। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দিচ্ছে চোখ রাঙানি। এই সময় এক বাদামওয়ালা আসলো বাদাম বিক্রি করতে। পাঁচ টাকার বাদাম কিনলো ছেলেটা। ক্ষুধা নষ্টের ভাল পন্থা বাদাম খাওয়া।

বাদামওয়ালার সাথে কথা বলে জানল, বেচারা বাদামওয়ালা পড়ালেখা করেনি। বাদাম বিক্রি করেই চলে সংসার। খুবই হতদরিদ্র অবস্থা। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। কিন্তু কী করবে? পড়ালেখা তো করেনি। ভাল চাকরি পাবে কিভাবে? এই বলে চলে গেল বাদামওয়ালা।

ছেলেটার মাথায় আসলো, "আরে আমি তো গ্রাজুয়েশন করছি। আজ হোক কাল হোক চাকরি একটা পাবোই। কিন্তু এই বাদাম বিক্রেতা তো কখনোই একটা চাকরি পাবে না।" নতুন উদ্যমে উঠে বসলো বেকার তরুণ। চোখের হতাশা কাটতে আরম্ভ করলো। কাল থেকেই শুরু হবে আবার চাকরির চেষ্টা। চলবে না থেমে থাকলে। মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলো সে।

৩।
ওদিকে সারা বিকেল বাদাম বিক্রি করে পার্কের পাশে একটা রাস্তায় বসে আছে বাদামওয়ালা। মন খারাপ। ইদানীং বিক্রি ভাল হচ্ছে না। এত কম টাকায় কিভাবে চলবে জীবন? মেয়েটা বড় হচ্ছে। ঘর ভাড়া, খাওয়া খরচ। বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। কত সমস্যা চারিদিকে ।

হঠাৎ তার চোখ পড়লো পার্কের সামনে মাটিতে বসা এক ভিক্ষুকের দিকে। লোকটার দুটা পা কাটা। সামান্য পথ চলতে গেলে মাটির সাথের ধূলাবালি জড়িয়ে যাচ্ছে গায়ে। অল্পতেই উঠছে হাঁপিয়ে।

বাদাম ওয়ালা ভাবল,
"আমি চাইলেই অন্য কিছু করে, পরিশ্রম করে পেট চালাতে পারবো। রিকশা চালাতে পারবো, ভ্যান চালাতে পারবো, ফেরি করতে পারবো। কিন্তু এই বেচারা?
সে তো বাথরুমে পর্যন্ত অন্যের সাহায্য ছাড়া যেতে পারে না।

বাড়ির দিকে চলল বাদামওয়ালা। কাল থেকেই নতুন কিছু করার চেষ্টা করবে। হাল ছাড়বে না সে, তার দাঁড়াবার মত দুটো শক্ত সবল পা আছে।

৪।
মাগরিবের আজান দিচ্ছে। বসে আছে সেই ভিক্ষুক। এক ট্রেন দুর্ঘটনায় দু পা হারিয়ে আজ সে অসহায়। নিজের ভাগ্যকে প্রতি নিয়ত দিয়ে যাচ্ছে অভিশাপ। হাঁটতে পারে না, চলতে পারে না। অন্যের ভিক্ষায় বেঁচে থাকতে হচ্ছে। অসহ্য লাগে এই দুনিয়া। কী দরকর তার বেঁচে থাকার?

হঠাতই পাশে অস্পষ্ট মিউ মিউ শব্দ শুনে তাকাল।

দেখল একটা বিড়াল পড়ে আছে। চোখ দুটো বন্ধ। বিড়ালটাকে উঠিয়ে নিতেই দেখল বিড়ালটার একটা পা জখম। ছোপ ছোপ লাল রক্ত।

"আহারে বেচারা! এই অবলা প্রাণী কাউকে বলতেও পারছে না নিজের দুঃখের কথা। সেই তুলনাই আমি তো নিজের মনের কথা বলতে পারি। বাসায় বউ আছে, বাচ্চা আছে। হাত তুলে খেতে পারি। তাদের সাথে গল্প করতে পারি। আমি যে মানুষ হয়ে আজ জন্মগ্রহন করতে পেরেছি, এটাও কম কি?"

বিড়ালটাকে তুলে নিয়ে সে বাসার দিকে চলল। আজ তার বউ মুরগি রেঁধেছে। মুরগিটা ছদকা হিসেবে পেয়েছে সে। নিজের অবস্থা ভেবে আর মন খারাপ করবে না ঠিক করলো। সে আশরাফুল মাখলুকাত। তার মন খারাপ করলে চলবে?

পরিশিষ্টঃ কেটে গেছে পাঁচ বছর।
বসন্তের চমৎকার একটা বিকেল। একটা পার্ক। একটা বেঞ্চে বসে আছে এক লোক। তার দুই বাচ্চাকে নিয়ে এসেছে সে। বাচ্চা দুইটি খেলছে। লোকটি পার্কের বেঞ্চে বসে ল্যাপটপ ব্যবহার করছে। দেশের একজন বড় ব্যবসায়ী সে। গত পাঁচ বছরে বেশ কয়েকটা প্রজেক্টে সফল হয়েছে। পেয়েছে শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তার পুরষ্কার।

পাশেই আরেকটা বেঞ্চে বসে আছে এক যুবক। সাথে সুন্দরী, মিষ্টি দেখতে একটা মেয়ে। মেয়েটা হয়তো ঐ ছেলের বউ বা প্রেমিকা। খুব হাত নেড়ে নেড়ে হেসে হেসে কথা বলছে দুইজনেই। খুব ভাল একটা কোম্পানিতে চাকরি করে ছেলেটা। ভাল বেতন।

ব্যবসায়ীর বাচ্চা দুইটা আবদার ধরল চিপস খাবে। পার্কের পাশেই একটা ছোট দোকান। চিপস, ড্রিংকস বিভিন্ন পণ্য দিয়ে সাজানো। ভালই বিক্রি দোকানটার।

পাঠক, চেনা যাচ্ছে লোকগুলোকে?

প্রথম ব্যক্তি হল সেই কোম্পানির মালিক। যার একটা কন্ট্রাক্ট হয়নি বলে তার মন খারাপ ছিল।

আর যুবক যে বসে আছে এক মেয়ের সাথে, সেই বেকার ছেলেটা।যে ঘুরছিল চাকরির জন্যে।

আর চিপস, ড্রিংকসের দোকানদার
হল পার্কের সেই বাদামওয়ালা। নিজ
পরিশ্রমে আজ সে এই ছোট
দোকানটার মালিক।

আর সেই ভিক্ষুক? কী হলো তার?

আমি কী জানি? আমার কি আর খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই,যে দুনিয়ার সবার খবর রাখবো।
তবে সেদিন সে ঐ বিড়ালটিকে বাসায়
নিয়ে সেবা দিয়ে সুস্থ
করে তুলেছিল। নিশ্চয় সে ঐ কাজের
পুরস্কার পাবে। কথায় আছে না,
"জীবে দয়া করে যে জন………….।"

উপদেশঃ নিজের
যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট
থাকা উচিৎ। তবেই আল্লাহ্ তা আরও
বাড়িয়ে দিবে।


Sakawat Hossain Munna

No comments:

Post a Comment