"বাবা, তুমি আইসা আমারে নিয়া যাও, ওরা আমারে মাইরা ফালাইতাছে"
শেষ
কথা গুলো ফোনে বলেছিল যৌতুকের বলি গৃহবধূ টুম্পা. পরে তার বাবা বাসায় গিয়ে
মেয়েকে দেখতে পাই। খুব সম্ভবত মারার পর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার
নাটক সাজানো হয়।
ইদানিং ধর্ষনের কথা আমরা সবাই বলি। ধর্ষন বিষয়টিকে যেভাবে হাইলাইট করা হয় যৌতুকের কথা সেইভাবে আসে না।
টুম্পাকে কিন্তু যৌতুক না দেওয়ার জন্য মারা হইনি। বিয়ের সময় ৩ লক্ষ টাকা ৭
ভরি স্বর্ণালংকার দেওয়া হয়েছিলো। যার লোভে পরবর্তি চাহিদা আরো বৃদ্ধি পাই।
বলি হতে হয় টুম্পাকে।
টুম্পার উদাহরন একজন না। আরো অনেকে আছে
আমাদের চারপাশে। সামান্য যৌতুকের জন্য যাদের উপর চলে নির্যাতন। কেউ মুখ
বুজে সইতে থাকে। কেউবা না পেরে আত্মহত্যা।
আমাদের মানসিকতা দিন দিন কতটা নিচে নামছে যার উদাহরণ এই ঘটনা গুলো।
তবুও আমরা দাঁত কেলিয়ে বলে বেড়ায় আমরা এক সভ্য সমাজে বাস করি।
আজ আরেকটা নিউজ হেড লাইন পরেছিলাম। যেখান এক নারীকে মধ্যযুগীয় কায়দায় গাছে
বেধে অত্যাচার করা হয় ডাকাত সন্দেহে। আত্মহত্যার ব্যাপার তো এখন নিত্য
নতুন ঘটনা।
আত্মহত্যার অধিকাংস হলো মেয়ে। কেউ সেক্সচুয়াল হেরেজমেন্টের শিকার, কেউ ধর্ষন, কেউবা যৌতুক। ঘটছে শুধু মেয়েদের সাথেই।
একটা ঘটনা আমার মত করেই বলি
ট্রেন করে বাড়ি ফেরার পথে মেয়েটির সাথে দেখা। পরনে বোরখা, চেহারায় হিজাব।
চোখ দুটোয় কেবল দেখা যাই। আমার পাশে বন্ধু রাফি। আমাদের ঠিক সামনের সিটে
মেয়েটি, পাশে তার বড় ভাই। চট্টগ্রাম যাচ্ছে।
রাফি আমার দিকে
তাকিয়ে একটু হাসতেই বুঝলাম আমার ভাবনা গুলো তার মাথায় ঘুরছে। কোনও মেয়ের
চোখ এত সুন্দর হয় কিভাবে? বাংলা ছায়াছবিতে নায়িকার চোখ আর হাসি দেখে নায়ক
প্রেমে গড়া গড়ি খায়। মেয়েটির চোখ জোড়া ছবির নায়িকাদের মত কিনা জানা নেই,
তবে কিছু একটা ছিলো যা দেখে প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া যাই।
অন্যের
কথায় কান পাতার স্বভাব আমার নেই। তবুও আজ সেই কাজটা করছি। এত মিষ্টি একটা
কণ্ঠ। শুধু শুনে ইচ্ছে হয়। আচ্ছন্ন করে রাখার ক্ষমতা সব কণ্ঠস্বরে থাকে না,
মেয়েটির আছে।
এসব ভাবতে গিয়ে লক্ষ করলাম, রাফি অনেক দূর এগিয়ে
গেছে। মেয়ে পটানোর ওস্তাদ কি এমনিতে বলি? আমি হলে মেয়েটির সাথে ভাব জমাতে
চাইতাম। রাফি ভাবনা আরো দূরে, মেয়েটি ভাইয়ের সাথে ভালোয় সক্ষতা গড়ে ফেলেছে
ইতিমধ্যে।
- তো ভাইয়া কোথায় যাচ্ছেন?
- চট্টগ্রাম
- বেড়াতে নাকি কোনও কাজে?
- শিফট হবো, তার আগে বোনকে রেখে আসছি।
এইভাবেই কথা এগোতে লাগলো। আমি মেয়েটিকে আর চোখে খেয়াল করছি সেটা সে বুঝতে পারাই লজ্জা পেলাম। আর তাকানোর সাহস পাচ্ছি না।
হঠাৎ করে কেনো যেন মেয়েটির চেহারা দেখার খুব ইচ্ছে হলো। যার চোখ, আর কণ্ঠ এত সুন্দর, সে মেয়েটির হাসি কেমন হতে পারে দেখতে?
ভাবতে ভাবতে ট্রেন কোনও এক প্লাটফর্মে থামলো। মেয়েটির ভাই নেমেছে কিছু
নিতে। সাথে রাফিও। আমি না নেমে বসে আছি, এই ফাঁকে মেয়েটির সাথে যদি আলাপ
জমানো যাই
অনেক্ষণ চুপ থেকে ইতস্থ করেই জিজ্ঞেস করলাম
- চট্টগ্রামে কোথায় নামবেন?
- ভাইয়া জানে
- এইবারই প্রথম?
- হুম্
তাঁরপর দুজনই চুপ, আমি কি বলে কথা এগনো যাই ভাবছি।
- আপনিও কি চট্টগ্রামে থাকেন?
- জ্বি ..
কথা আর বেশি দূর আগানো যাইনি। তার আগেই রাফি আর মেয়েটির ভাই হাজির। রাফির চেহারা দেখে বুঝলাম, ভাইকে পটিয়ে ফেলেছে সে।
- তো ভাইয়া, চট্টগ্রাম কেনো শিফট হচ্ছেন বললেন না তো? _ বলল রাফি।
রাফির প্রশ্ন শুনে ইতস্থ ভাবটা লক্ষ করলাম ভাইয়ার চেহারায়। ক্ষানিক চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন
- আমার বোন দীপার জন্য
- পড়ালেখা? _ রাফির ফের প্রশ্ন
ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলতে শুরু করলেন আবার
- ঠিক তা না, পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
এমন কথা শুনে অবাক হওয়া স্বাভাবিক। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি।
ভাইয়া পরে যা শোনালেন তা শুনে আমরা দুজনই স্তব্দ। বিশ্বাস হচ্ছিল না কথা গুলো।
ক্ষানিক আগে যে মেয়েটির চেহারা, আর হাসি দেখার জন্য উদগ্রিব হচ্ছিলাম, যদি
শুনতে হয় সে মেয়েটির হিজাবে ঢাকা চেহারা এসিডে ঝলসানো তখন কি দেখার সাহস
থাকবে?
মেয়েটির সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো সে দেখতে সুন্দর।
প্রভাবশালী ছেলের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান যার করুণ পরিণতি দেখতে
হয়েছিলো মেয়েটিকে। এসিড মেরে ক্ষান্ত হইনি, সম্মান বাঁচাতে চিরচেনা জায়গাটা
ছাড়তে হয়েছে তাদের।
কথা গুলো শোনার পর আমরা দুজনেই চুপ। আশেপাশে
দুএকজন শুনছিল তারা ও। একবার দীপার চোখে তাকালাম, তার চোখে পানি স্পষ্ট।
আমি ঐ চোখে দ্বিতীয়বার আর তাকানোর সাহস পাইনি।
ঘটনা শুধু এটা না। দীপার মত আরো অনেকে আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে আছে।
আমার এক বন্ধুর বড় বোন। বাবা সাধ করে বিয়ে দিয়েছিলো বড় ঘরে। টাকা পয়সা
তাদের কমতি ছিল না। ছেলে পক্ষের সব আব্দার পুরন করতো। তবুও আপুর উপর
নির্যাতন থামেনি। তার মুখেও এসিড মারা হয়েছিলো। আপুর সামনে গেলে মুখ লুকিয়ে
থাকে। তার চেহারায় লুকিয়ে আছে সমাজের কুৎসিত রুপ। তিনি আড়ালে লুকিয়ে যান।
আমরা তাদের এড়িয়ে চলি।
একটা মেয়ে তার পুরো জীবনে সমাজের প্রতিটা স্তরে কতটা নিগৃহীত কতটা লাঞ্চনার শিকার হয় তা একজন মেয়ে বলতে পারবে।
মাঝে মাঝে অনেক মেয়ের লেখাপড়ি। সমাজে তাদের লাঞ্চনার কথা গুলো তুলে ধরে।
মাঝে মাঝে মনে হয় ঘটনা গুলো কি সত্য নাকি বানানো? আমার চারপাশের মেয়ে
গুলোকে ভালোয় দেখি।
একটু ভাবলে উত্তর টা সামনে আসে। আমাদের ভাবনা
গুলো আশেপাশে আটকে আছে। আশাপাশে কয়েকজনকে দেখে আমরা বলে ফেলি, ধুর এসব এখন
হয় নাকি। যখন দীপার মত মেয়েরা আমাদের সামনে আসে তখন প্রশ্ন গুলো ভাবাই। আমি
কি একটা সুস্থ সমাজে বাস করছি?
সেক্সচুয়াল হেরেজমেন্টের কথা
শুনলে অনেকে তেলে বেগুনে জলে উঠে। সব দোষ মেয়েটির। দীপার তাহলে এমন হলো
কেন?? মাঝে মাঝে মনে হয় আসলে এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। যেখানে মেয়ে মানেই
ভোগের পণ্য।
সবচেয়ে মজার বিষয়। আমাদের সামনে যখন কোনও ধর্ষনের
ঘটনা আমাদের সামনে আসে সেটা নিয়ে তোলপাড় লেগে যায়। অথচ মেয়েদের মধ্যে
আমাদের আশাপাশে অনেকেই নানাভাবে ধর্ষন হচ্ছে। এসব নিয়ে আমাদের ভাবাই না।
কেনো? ঐ যে বললাম, আমাদের ভাবনা গুলো একটা গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
আমরা এতটা নিচে নামছি যে কাউকে এসিড মারতে হাত কাঁপছে না। কাউকে অত্যাচার
করতে করতে মেরে ফেললেও বিবেকে বাধে না। সত্যি বলতে আমরা যতটাই সভ্য দেখাই
না কেনো, যতই বলি না কেনো আমরা ডিজিটাল যুগে বাস করছি, সব ক্ষেত্রে মেয়েরাই
কিন্তু পাশবিক বর্বরতার শিকার হচ্ছে।
এসিডে ঝলসে যাওয়া মেয়েটাকে
দেখলে গা গিরগির করবে আমাদের। অতচ সেই সমাজে আমরা দিব্যি স্বাভাবিক ভাবে
চলে যাই। অদের জন্য দিতে পারি তা কেবল সমবেদনা। নাথিং এলস।
সমাজকে
গালি দিয়ে লাভ নেই। আমরাই সমাজকে এমন বানিয়েছি। কিছু হলুদ কি-বোর্ডে ঝড়,
যেমন আমি করছি। এতেই প্রতিবাদ শেষ। এর থেকে বের হয়ে আসতে পারি না।
মাঝে মাঝে এসব দেখে আমারও অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সামর্থ কিংবা
উপায় কোনটা নেই। আমিও পরিবারের বাধ্য বাধ কতাই আটকা পরে আছি। সবার আগে
পড়ালেখা, পরিবারের মানুষ গুলো তাকিয়ে। অন্যদিকে তাকানোর সাহস নেই। আমার আরো
মত অনেকেই।
আমরা যদি একটা জেনারেশন তৈরী করতে পারি তাহলে সমাজের পরিবর্তন এমনিতেই আসবে। কিন্তু সেই জেনারেশন আদো হবে তা ভাবনায় থেকে যাই।
একটা কথা খুব ভাবাই, টুম্পা মারা গিয়ে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু দীপারা
সমাজের কুৎসিত রূপটা দেখে কি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে? কখনো না। যতবারই
দিপারা আয়নার সামনে দাঁড়াবে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য ততবার আমাদের সমাজের
কুৎসিত রুপ তার চেহারায় ভেসে উঠবে।
আশরাফ মামুন
No comments:
Post a Comment