--মামা…
--হ্যা রুম্পা কিছু বলবি??
রুম্পা মাথা নিচু করে কাচুমুচু করছে। আমি জানি এই মুহুর্তে ও ভয় পাচ্ছে আমাকে। আমি হাসিমুখে রুম্পার দিকে তাকালাম। ওর হাতে একটা মিস্টির কাটুন। বললাম, "কিরে কিছু বলবি? ওগুলো কী?"
--মিষ্টি মামা।
--কিসের মিস্টি?
--আগে খাও।
আমি একটা মিস্টি তুলে মুখে পুরে নিলাম। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করলাম, "কিরে, বলবিনা কিসের মিস্টি?
ক্ষীন স্বরে রুম্পা বলল, মামা, একটু আমার সাথে চলনা। মামিকে একটা মিস্টি খাওয়াবো।
আমি বুঝলাম না কিছুই।
--আগে বলবি তো কিসের মিস্টি??
--চলনা মামা, মামিকে মিস্টি খাওয়াবো।
আমি রুম্পার দিকে তাকালাম। আমার চোখে চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। মাথাটা নিচে নামিয়ে নিল।
আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা এই মেয়েটাকে আল্লাহ কী দিয়ে তৈরী করেছে? এতটুকুও কি রাগ-গোস্বা নেই তার্।
গ্রামে আমাদের বাড়িতে কাজের মেয়ে রহিমার মেয়ে রুম্পা। রুম্পা খুব ছোট ছিল। একদিন হঠাত আমাদের রান্না ঘরে আগুন লেগে যায়, আর সেই ঘরেই রান্না করছিল কাজের বেটি রহিমা। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যবসত সেদিন সেখান থেকে বেরোতে পারেনি রহিমা। আগুন নিভানোর পর শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে বেরিয়েছিল রহিমা।
এরপর থেকে আমার বাবাই রুম্পার দায়-দায়িত্ব নিয়েছিল। তাকে স্কুলেও ভর্তি করিয়েছিল। আমি তখনো ঢাকায় ছিলাম। একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি, সেই জন্যই অনেক আগেই গ্রাম ছেড়েছিলাম।
একবার ঈদে গ্রামে গিয়ে রহিমা আর তার মেয়ে রুম্পার ব্যাপারে বিস্তারিত জানলাম। ভালভাবে রুম্পাকে বুঝে-দেখলাম এক অসাধারন মেধা রুম্পার মধ্যে লুকায়িত আছে। সামান্য সুযোগ পেলেই তা প্রতিভাত হতে পারে সবার সামনে। দীর্ঘদিন অধ্যাপনার পেশায় আছি, ছাত্র-ছাত্রী চেনায় অন্তত এতটুকু ভুল আমার হতে পারেনা।
এরপর বাবাকে বলে রুম্পাকে উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার জন্য ঢাকায় নিয়ে এলাম আমি। প্রথম প্রথম আমার সিদ্ধান্তের চরম বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল সিমা মানে আমার স্ত্রী। সে কোনমতেই একটা গ্রাম্য মেয়েকে আমাদের বাসায় রাখবেনা। শেষপর্যন্ত আমার জোড়াজুড়িতে মানতে বাধ্য হয়েছিল। রুম্পাকে নিয়ে এলাম ঢাকায়।
কিছুদিনের মধ্যেই টের পেলাম রুম্পা এখানে সুখে নেই। এতটুকুন বাচ্চাকে নির্দয়ভাবে কাজের মেয়ের মত খাটাচ্ছে সিমা। আমি বুঝতে পেরে একটা ভাল গার্লস স্কুলে ভর্তি করিয়ে হোস্টেলে উঠিয়ে দিলাম তাকে।
এই নিয়ে সিমার সাথে প্রায় কথা কাটাকাটি হতো আমার্। একটা এতিম বাচ্চার জন্য প্রতিমাসে যে টাকাটা খরচ হতো, সেটা কিছুতেই মানতে পারতো না সিমা। এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিনগুলো। তবে একটা কথা না মানলেই নয়, রুম্পা আসার পর থেকে সিমার সাথে মনোমালিন্য থাকাটা অন্য ব্যাপার ছিল, কিন্তু আমার কর্মশালায় আমার উন্নতি আমি হারে হারে টের পাচ্ছিলাম। কিছুদিনের মধ্যেই আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার অফার পেলাম। এভাবে ধীরে ধীরে অনেক পদোন্নতি ঘটেছিল আমার্। আমি বুঝতে পারছিলাম, আল্লাহ রুম্পাকে আমার জীবনের যশ হিসেবেই পাঠিয়েছেন।
রুম্পার রেজাল্টও যথারীতি ভাল প্রতি ক্লাসেই। প্রতিবারেই নিজ ক্লাসে ফার্স্ট। এভাবেই মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি টপকিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে
আজ সকালের ঘটনা বলি। সিমা ড্রয়ারে রাখা তিন হাজার টাকা খুজে পাচ্ছিলনা। আর রুম্পাও দুদিন হলো এসেছে আমাদের বাসায়। এক্ষনও রুম্পাকে দু-চোক্ষে দেখতে পারেনা সিমা। আমি আসলে বুঝতে পারিনা, কোন জালেমের কঠিন মন দিয়ে সিমার হৃদয়টা গড়া হয়েছে। বিবাহিত জীবনের পচিশ বছর হতে চললো, অথচ আল্লাহ কোন সন্তান দেয়নি আমাদের জীবনে। সিমা চাইলেই কিন্তু রুম্পাকে নিজের সন্তানের স্থানটা দিতে পারতো, কিন্তু না। তার কিছুই হয়নি।
যাই হোক, যেহেতু রুম্পার সিমার সহ্যাতীত, তাই সবার আগে রুম্পাকেই চোরের আখ্যা দিয়ে বলল টাকা কোথায় রেখেছিস?
রুম্পা মাথা নিচু করে বলল, "আমি টাকা নেইনি মামি।"
--ফের মিথ্যা কথা? _চেচিয়ে উঠল সিমা। রুম্পারও চোখ দিয়ে গড়গড়িয়ে পানি ঝরতে লাগল।
এরপর সিমা নিজে গিয়ে রুম্পার ব্যাগ চেক করতে লাগলো। পেয়েও গেল তিনহাজার টাকা। তারপর সশব্দে দুই গালে দুটো থাপ্পড় জুটেছিল রুম্পার গালে। তখন থেকেই কাদছিল রুম্পা।
এরপর একটা কল আসে। কিছুক্ষন কথা বলে রুম্পা বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। আমিও কিছু বলিনি। সত্যি বলতে, রুম্পার কাজে লজ্জায় আমারও মাথা হেট হয়ে গিয়েছিল।
এখন রুম্পা মিস্টি নিয়ে এসেছে। সাথে জেদ ধরেছে মামীকেও খাওয়াবে। আমি বললাম চল তোর মামির কাছে। আমরা দুজনে হেটে যাচ্ছি। আমার পাশ ঘেষে একটু পিছনে হাটছে রুম্পা। আমি বললাম,
--সকালে খুব লেগেছিল না রে?? তুই আমাকে বললেও তো পারতি। আমিই দিয়ে দিতাম তিন হাজার টাকা। চুরি করতে গেলি কেন??
রুম্পা কোন কথা বলল না। মাথা নিচু করেই রইলো। তবে আমার খুব মনে হচ্ছে রুম্পা এই কাজটা করতে পারেনা। সকালে রুম্পা বারবার কাদতে কাদতে বলছিল সে চুরি করেনি। কিন্তু যখন হাতে নাতে ধরা পড়ল, তখন থেকেই চুপটি হয়ে গেছে মেয়েটা।
সিমা নিজের রুমে বসে আছে। আমাদের দেখে একটু নড়েচড়ে উঠল। তারপর মোটামুটি ইঙ্গিতে আমাদের প্রবেশের অনুমতি দিলেন। রুম্পার হাতে মিস্টি দেখে খানিকটা অবাকও হয়েছে।
বুঝা সহজ, রুম্পার উপর খুব রেগে আছে সিমা। কিন্তু আমি সিমার চোখে তার কোন ছাপই দেখলাম না। অন্যান্য সবসময় রুম্পাকে দেখলেই সিমার চেহারা পালটে যেত, আজ সকালে পর্যন্তও তাই হয়েছে। কিন্তু ……¿¿ কি জানি! হয়তো আমিই ভুল দেখছি।
রুম্পা ভয়ে ভয়ে মামির দিকে একটা মিস্টি তুলে দিল। সিমা বেশ ঠান্ডা ভাবেই বলল,
--কিসের মিস্টি এটা?
সিমার কথায় হাতগুলো কেপে উঠল রুম্পার্। তারপর আমার দিয়ে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল,
--আসলে মামা, আজ আমাদের অনার্সের রেজাল্ট হয়েছে। আমি ……
সিমা বেশ উতসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুই কী??
--আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি মামি। তাই এই মিস্টি………
কথাগুলো বলতে বলতেই কেদে দিল রুম্পা। হয়তো মামির ভয়েই কেদে দিয়েছে। সারাটা জীবন তো শুধু অবহেলায় পেয়েছে মামির কাছ থেকে।
কিছুক্ষন মৌনতায় কেটে গেল এভাবে। আমিই শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভাঙ্গালাম। খুশিতে এই বুড়ো বয়সে নাচতে ইচ্ছে করছিল। আমি সিমার দিয়ে তাকিয়ে বললাম,
--দেখেছ সিমা, রুম্পার ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। মেয়েটা হয়তো কিছু একটা কিনার জন্যই ড্রয়ার থেকে টাকা গুলো নিয়েছিল। এজন্য এভাবে ওকে মারাটা ঠিক হয়নি তোমার্।
সিমা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল,
--টাকাটা রুম্পা চুরি করেনি। আমিই ভুলে গিয়েছিলাম যে টাকাটা আমি আমার পার্সটাতে রেখেছিলাম। আর ওর ব্যাগে যেটা পেয়েছি ওটা সম্ভবত রুম্পারই টাকা।
আমি অবাক হলাম। রাগে গা রিরি করছে। ইচ্ছে করছে সিমাকে একটা কষিয়ে থাপ্পড় মারি। যাই হোক, যেকোন ভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করে রুম্পাকে বললাম, "কিরে তোর টাকা তুই জানালিনা কেন?"
রুম্পা মাথা নিচু করে বলল, "আমি বলেছিলাম মামা। আমি চুরি করিনি। হলে থাকতে একটা টিউশনি করাতাম আমি। গত পরশু তারই একমাসের বেতন বাবদ তিন হাজার টাকা পেয়েছি। ভেবেছিলাম, এই টাকা দিয়ে আজ ভাল রেজাল্ট হলে তোমাদের জন্য কিছু কিনবো। অল্প টাকা, তাই এখান থেকে তোমার জন্য একটা ঘড়ি আর মামির জন্য অল্প সোনা দিয়ে একটা আংটি বানাতে চেয়েছিলাম।"
আর কিছু বলার সুযোগ পেল না রুম্পা। আরো একটা থাপ্পড়ে চমকে গেল সে। আমিও চমকালাম। রুম্পাকে থাপ্পড় দিয়ে নিজেই কাদছে সিমা। রুম্পা চুপ। আমিও চুপ।
এরপরের ঘটনাটা বুঝে নেন।আজ রুম্পাকে আমার চেয়েও বেশি ভালবাসে সিমা। রুম্পাকে নাকি এখন সিমার মেয়ে। লক্ষী-আদুরে মেয় |
jeffy mahin
No comments:
Post a Comment